আর্কিটেক লুই আই কান অমর ডিজাইন আমাদের সংসদ


সেই ষাটের দশকের শুরুর দিকে কথা । তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তান সরকার  একটি পরিকল্পনা নিলেন ঢাকাকে দ্বিতীয় রাজধানী করার। তাদের পরিকল্পনায় পশ্চিম পাকিস্তানে থাকবে ফেডারেল রাজধানী।আগারগাঁও এ পরিকল্পনা নেওয়া হলো দ্বিতীয় রাজধানী করার। এত দুদ্দেশ্যে  তেজগাঁও  এগ্রিকালচারাল কলেজের ফার্মল্যান্ড সহ আশেপাশের ১৩৬ একর  জমি অধিগ্রহণ করা হয়।  তখন সেখানে স্থায়ী কোন অবকাঠোমো ছিল না, খেজুর বাগান ছিল, যার আদলে  খামারবাড়ীর কাছে একটি কেজুর বাগান করা হয়েছে বলে জানি।  জাতীয় সংসদের স্থায়ী আসন পূর্ব পাকিস্তানে  করার জন্য এই মাস্টার প্লান করা হয়। পরিকল্পনায় মন্ত্রীদের হোস্টেল, গেজেটেড অফিসার,  নন-গেজেটেড অফিসার ও সংসদ সদস্যদের জন্য বিভিন্ন টাইপের  হোস্টেলের  প্রস্তাবনা করা হয়। সেই প্রস্তাবনা অনুযায়ী  বর্তমান সংসদ ভবনের দক্ষিণ দিকে এ, বি, সি, ডি টাইপ কোয়ার্টার  এবং  উত্তর দিকে আগারগাঁওর দিকে ই, এফ, জি এবং এইচ  টাইপের কোয়ার্টার  করা হয়। বর্তমানে যেখানে  সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল, সেটি তখন ছিল  আইয়ুব সেন্ট্রাল হসপিটাল।  যা হোক  যতটুকু মনে পড়ে যাটের দশকের শুরুতে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্ববান করা হয়। লুই আই কানের সুনাম ছিল । তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বখ্যাত  স্থপতি, তার উপস্থাপিত নকশাই গ্রহণ করা হয়।  ছোট একটি ধারণা থেকে  তার  এই স্থাপনার নকশা প্রণয়ন শুরু করেন। তিনি একটি ক্রস আঁকেন। এই ক্রস এর উপর  আরও দুইটি  রেখা দ্বারা  কেন্দ্র ছেদ করেন, এরপর মধ্যবর্তী দুই রেখা আরেকটি রেখা দিয়ে সংযুক্ত করেন। এই অষ্টভুজী ক্ষেত্রই অ্যাসেম্বলী হল এবং প্রতিটি রেখা  বরাবর  চতুর্ভজ অঙ্কন করেন,  যা  প্রেসিডেনশিয়াল স্কোয়ার, দক্ষিণ পূর্ব প্লাজা, পূর্ব-পশ্চিম প্লাজা, উত্তর-পূর্ব প্লাজা,  জিই, উত্তর পশ্চিম, ডব্লিউই, এবং দক্ষিণ পশ্চিম প্লাজা হিসাবে প্রস্তাবিত হয়।  অ্যাসেম্বিলি হলের উচ্চতা হয় ১৪০ ফুট,  যার উপর  আটটি  অংশে বিভক্ত  একটি  গ্লাস নির্মিত ছাতা সদৃশ  ছাদ রয়েছে,  যা কংক্রিট দ্বারা  নির্মিত।  সমগ্র সংসদ ভবনের পার্টিশনগুলোতে  রিইনফোর্সড কংক্রিট ব্যবহার করা হয়।  বিভিন্ন সময়  সাইট ভিজিটে এলে লুই আই কান  কংক্রিট নিয়ে কতগুলো নিজস্ব মতামত শেয়ার করতেন  কংক্রিট সম্পর্কে তার বক্তব্য, “Concrete is used  as  a structural material. It has no shape of its own; it takes the shape of ‘form work’. So if the formwork is perfect, concrete can be used as architectural materials too.” (বাংলা অর্থ: কংক্রিট প্রধানত কাঠামো নির্মাণের উপকরণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এর নিজস্ব কোন কাঠামো নেই, এটি ‘ফর্ম ওয়ার্কের’ আকার প্রাপ্ত হয়। সুতরাং ফর্ম ওয়ার্ক যদি  সঠিক হয়, তাহলে কংক্রিটকে  স্থাপত্যগত উপাদান হিসেবেও ব্যবহার করা যায়।)

তার বক্তব্য ছিল কংক্রিট  এর সুন্দর আকার প্রাপ্তির মধ্য দিয়েই একটি উন্নত, পরিচ্ছন্ন ও দৃষ্টিগ্রাহ্য  নান্দনিক  স্থাপনা নির্মাণ করা যায়। এ জাতীয়  কংক্রিটকে  অফ্ দি ফর্ম কংক্রিট, ফেয়ারফেস কংক্রিট, বেয়ার কংক্রিট বা ফিনিশড কংক্রিট বলা হয়। প্রচলিত নির্মাণ শৈলীতে  কংক্রিটকে  ফর্মওয়ার্কের মাধ্যমে  নিখুঁত করার কোন প্রয়াস  আমাদের মধ্যে ছিল কিনা আমি বলতে পারবো না, তবে  লুই আই কান আমাদের এই  বিষয়টি  অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে স্মরণ করিয়ে দেন। তার  উপদেশ প্রদানের পর প্রায়  ৫৫ বছর পর আমরা  কিছু স্থাপনা নির্মাণ হতে দেখছি রাজধানীতে যেখানে ফর্ম ওয়ার্ককে পারফেক্ট করে  কংক্রিট দিয়েই  ইমারতের  বর্হিভাগ তৈরী করা হচ্ছে।  এই  প্রেরণা আমার পেয়েছিলাম লুই আই কানের নিকট থেকে। হানি কম্ব নিয়ে আমার একটি মজার অভিজ্ঞতা আছে  । হানি কম্ব হলো কংক্রিট ঢালাইয়ের পর  দৃশ্যমান পাথর বা খোয়ার টুকরা। এটা অনেক সময় হয় পানির কারণে বা কংক্রিটের  মিশ্রনের হের ফেরের কারণে। তো আমাদের এক সহকর্মী  সংসদ ভবন নির্মাণের সময় হানি কম্ব দেখা দিলে তাড়াতাড়ি সিমেন্ট দিয়ে ঢেকে দিয়ার তাগিদ দিতেন কিন্তু খবরটি লুই আই কানের নজরে আসে। তিনি বিষয়টি জেনে খুবই ক্ষুব্ধ হন। তিনি  বলেন, ” Honeycomb is the natural form of concrete.” ( বাংলা : হানিকম্ব হচ্ছে কংক্রিটের স্বাভাবিক রূপ।”  হানিকম্বও নির্মানশৈলীতে দ্যোতনা যুক্ত করতে পারে। এখানে কৃত্রিমতা আরোপের কোন দরকার নেই।  এই দিকগুলো বিবেচনা করে আমি লুই আই কানকে প্রকৃতিবাদী স্থপতি বলতে চাই। আগেই বলেছি তিনি ফর্ম ওয়ার্কের নিখুঁত নির্মাণের উপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতেন। তার বক্তব্য ছিল, ফর্ম ওয়ার্ক ভাল হলে, ফর্ম ওয়ার্ক থেকে কংক্রিট সরালে সেখানে আর কোন  ট্রিটমেন্ট দরকার নেই। কংক্রিট এবং রেডব্রিকসকে তিনি  ন্যাচারাল এবং এফিসিয়েন্ট বা উপযুক্ত উপাদান বলে গণ্য করেন।  তিনি ন্যাচারাল উপাদানকে দুইভাগে ভাগ করেন। যথা,  আল্লাহর তৈরী  প্রাকৃতিক এবং মানব তৈরী প্রাকৃতিক ।  পাথর হচ্ছে  আল্লাহ প্রদত্ত প্রাকৃতিক এবং  ইট হচেছ  মানবসৃষ্ট প্রাকৃতিক। মানুষ  ইটের আকার দেয়, কিন্তু ইটের রং দিতে পারে না,  ইটের রং প্রাকৃতিকভাবে প্রাপ্ত হয় ।   অক্সিডাইজিং ফ্লেম এবং রিডিউসিং ফ্লেম প্রয়োগ করে  যথাক্রমে লাল এবং কাল ইট প্রস্তুত করা হয়।  সংসদ ভবনে কংক্রিটের পাশাপাশি পাথর এবং লাল ইট ফিনিশিং ম্যাটেরিয়াল বা চুড়ান্ত উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। চুন বা বালি বা অন্য কোন উপকরণ দিয়ে প্লাস্টার করার বিষয়টি তিনি নিরুৎসাহিত করতেন। তার কথা ছিল, ” Plaster is nothing, but covering of bad workmanship.”  ( বাংলা : আস্তরন খারাপ নির্মাণ কাজকে ঢাকা দেওয়া ছাড়া আর কিছুই নয়।” )  তিনি বলতেন কংক্রিট এবং ইট  এর কাজ নিখুঁত করা গেলে বাইরে কোন আবরণ দেওয়ার দরকার হয় না। তার এই দর্শন যে কতটা বাস্তবসম্মত, তা নির্মান শৈলী লক্ষ্য করলেই বুঝা যাবে। সেই সকল প্রকল্পে  সিমেন্টের আস্তরণ দেখা যায়, যার কংক্রিট গড়ন ভাল না, যা অধিকাংশ ক্ষেত্রে তড়িঘড়ি করে করা হয় এবং যেগুলোর স্থায়িত্ব কম।

প্রসঙ্গক্রমে আমি  সংসদভবনে পাথর সরবরাহ, ইট এবং কাঠ সরবরাহকারীর বর্ণনা দিতে চাই। তারা এই ইতিহাসের সঙ্গী। পশ্চিম পাকিস্তানী এজহার সাহেব  সংসদ ভবনে ব্যবহৃত বিভিন্ন আকৃতির পাথর সরবরাহ করতেন। তার  কারখানা ছিল বর্তমানে শ্যামলী শিশুপার্কের জায়গায়। সেখানে তখন কোন স্থাপনা ছিল না। আর কাঠের সরবরাহকারী ছিলেন ইস্টার্ণ উড ওয়ার্ক, যার কারখানা ছিল তেজগাঁও। আর লাল ইট সরবরাহকারী ছিলেন তাবানী বেভারেজের মালিকানাধীন মিরপুর সিরামিকস ওয়ার্কস।

লুই আই কানের স্থাপত্যকলার অন্যতম অভিনবত্বে ভরপুর ধারনা ছিল  আলো এবং ছায়া সম্পর্কিত ধারনা । তিনি বলতেন, ” Source of light  will not be visible, only the lighted surface will be visible.”  ( বাংলা : আলোর উৎস্য  দৃশ্যমান হবে না, কেবল  আলোকিত অংশই দৃশ্যমান হবে।) আলো সম্পর্কিত এই দর্শনই বর্তমান সংসদ ভবনের প্রতিটি পরতে দৃষ্টিগোচর হয়। আলো এবং ছায়ার এক মায়াবী রূপকল্প তৈরীর জন্য ব্যাফল এন্ড জিগজ্যাগ ওয়াল তৈরী করা হয়। লিনটেলে খিলান দেওয়া হয় এবং ত্রিভুজাকৃতি বিশাল ওপের স্পেস রাখা হয়। এর মধ্য দিয়ে বহির্ভাগের আলো প্রবেশ করা হয়।  তিনি ঈশ^রবাদী ছিলেন, গীর্জার প্রার্থনা কক্ষের মত  সুবিশাল একটি কক্ষ তার পরিকল্পনাকে ব্যাপৃত করেছিল।  যদিও এটি নিয়ে বিতর্কের অন্ত নেই। কিন্তু সংসদ ভবনে আলো আর ছায়ার  ছন্দোবদ্ধ প্রয়াস লক্ষ করার জন্য এর কি কোন বিকল্প ছিল ?  চারদিকে পানির উপস্থিতি তার প্রকৃতিবান্ধব মনের বহিঃপ্রকাশ। আজ নদী গিলে খাওয়ার যে সর্বগ্রাসী প্রয়াস লক্ষ্য করা যাচ্ছে, সেখানে লুই আই কানের স্থাপত্যে নদীর অনিবার্যতা আমাদেরকে কি শুভ বুদ্ধির উদয় ঘটাবে?

সংসদ ভবন  নির্মানের পরিকল্পনায় পাকিস্তানী নির্ধারক মিনারের উপস্থিতি চেয়েছিলেন সে জন্য লুই আই কানের প্রাথমিক পরিকল্পনায় চার দিকে চারটি  মিনারের কথা ছিল, ইসলামী প্রজাতন্ত্র পাকিস্তানের শাসনতান্ত্রিক পীঠস্থানে আজান দেওয়ার কথা ছিল সেই মিনারের উপর থেকে। কিন্তু  বাস্তবায়ন – পরিকল্পনায় (একসিকিউশন পরিকল্পনা) আর এই মিনারের  কোন স্থান ছিল না। পরবর্তী স্বাধীনতার পরে লুই আই কানের সাথে চুক্তি নবায়ন করা হয়নি  এবং তৎ কালীন পিডব্লিউ এর কর্নধার বাসার সাহেব লুই আই কানের অনেক পরিকল্পনাই কাট ছাট করেন।  মিনার নির্মান তো দূরের কথা।  যদি মিনার নির্মান করা হতো তাহলো একটি হোত বর্তমানে খামার বাড়ির মোড়ে চত্বর, আরেকটি হোত বিজয় সরনীর শুরুতে  বিমানের কাছে, আরেকটি হোত বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর বাসস্থানের কাছে এবং আরেকটি মানিক মিয়া এভিনিউর কোন একটি স্পটে।





Facebook Comments