দেশে চিকিৎসক, প্রকৌশলীরাই বেশি বেকার….!!


বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষিতরাই সবচেয়ে বেশি বেকার। চাকরির বাজারে কেবল মোটামুটি অবস্থানে আছে স্নাতক ও এর সমপর্যায়ের ডিগ্রিধারীরা, ভাল অবস্থানে আছেন ডিপ্লোমা এবং টেকনিশিয়ানরা। দেশের সকল সেক্টরে টেকনিশিয়ানের প্রচুর অভাব, বেশি লেখাপড়া করলেও চাকরির বাজারে সুবিধা করতে পারছেন না উচ্চ ডিগ্রিধারীরা।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশে সবচেয়ে বেশি বেকার চিকিৎসক ও প্রকৌশলীরা। আর বেকারত্বের দিক থেকে তৃতীয় অবস্থানে আছেন স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারীরা। অথচ দেশে চিকিৎসক বা প্রকৌশলী হতেই সবচেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় করতে হয়।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বেকারদের মধ্যে চিকিৎসক-প্রকৌশলীদের হার ১৪ দশমিক ৪৭ শতাংশ। এ মধ্যে নারী চিকিৎসক-প্রকৌশলীদের অবস্থা আরও বেশী খারাপ, বিশেষ করে নারী প্রকৌশলীরা উল্লেখযোগ্য হারে বেকার। তাঁদের মধ্যে বেকারত্বের হার প্রায় ৩১ শতাংশ। এর পরেই আছেন উচ্চমাধ্যমিক ডিগ্রিধারীরা। তাঁদের ক্ষেত্রে বেকারত্বের হার ১৩ দশমিক ৯৪ শতাংশ। আর বেকারদের মধ্যে তৃতীয় স্থানে আছেন স্নাতকোত্তররা, ১০ দশমিক ২৫ শতাংশ।
বিঅাইডিএস এর জরিপে বলছে, স্নাতক ডিগ্রিধারীরাই চাকরি কিংবা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে বেশি সম্পৃক্ত থাকেন। স্নাতক বা সমমানের ডিগ্রিধারীদের মধ্যে মাত্র দশমিক ৫০ শতাংশ বেকার। আর কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা গ্রহণকারীদের কেউ বেকার থাকেন না। এ দেশের বাস্তবতায় স্নাতক ডিগ্রিধারীদের মধ্যে ভালো চাকরির প্রত্যাশা কম থাকে। তাই যেকোনো ধরনের চাকরি পেলেই তাঁরা করেন অথবা ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। আর স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারীদের মধ্যে চাকরির প্রত্যাশা বেশি থাকে। তাই সন্তোষজনক চাকরি না পাওয়ায় বেকার জীবন যাপন করেন। তবে অশিক্ষিত বা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই এমন ব্যক্তিদের মধ্যে বেকারত্বের হার বেশ কম। ১০০ অশিক্ষিত ব্যক্তির মধ্যে মাত্র তিনজনেরও কম বেকার থাকেন। বিবিএসের হিসাবে এই হার ২ দশমিক ৮২ জন। মূলত দেশের কৃষি খাতের শ্রমবাজারে তাঁরা কাজ করে থাকেন।



তবে অশিক্ষিত বা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই এমন নারীদের প্রায় ৯৬ শতাংশই কৃষি কিংবা অন্য খাতের সঙ্গে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত রয়েছেন। এ ছাড়া প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়েছেন এমন ব্যক্তিদের মধ্যেও বেকারত্বের হার এক অঙ্কের ঘরে।
দেশে বেকারের সংখ্যা ৮০ লাখ ২৫ হাজার, যা মোট শ্রমশক্তির ১৪ দশমিক ১৬ শতাংশ। বিবিএসের হিসাবে দেশে ২৫ লাখ ৬৭ হাজার কর্মহীনের বাইরেও আরও ৫৪ লাখ ৫৮ হাজার মানুষ আছেন, যাঁরা গৃহে সপ্তাহে অন্তত ১৫ ঘণ্টার কম কাজ করেন কিন্তু কোনো মজুরি পান না। বেকারদের মধ্যে আবার নারীদের সংখ্যাই অনেক বেশি। পুরুষ বেকারের হার ৬ দশমিক ৬৩ শতাংশ, আর নারী বেকার ৩১ দশমিক ৪৯ শতাংশ। অর্থাৎ গৃহস্থালির কাজে মজুরি পান না সাড়ে ৪৪ লাখ নারী।
বেকারত্বের মূল কারন হচ্ছে পরিকল্পিত এবং মান মত শিক্ষার অভাব। আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় কখনো শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বাজারি শিক্ষার দিকে ঝুঁকতে গিয়ে মৌলিক বিষয়ের শিক্ষা অবহেলিত হচ্ছে। এতে উচ্চশিক্ষা গ্রহণকারী অধিকাংশ শিক্ষার্থীই যথার্থ ও যুগোপযোগী জ্ঞান লাভ করতে পারছে না। উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা শুরু হয়। কিন্তু গুটিকয়েক বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ই মানসম্পন্ন শিক্ষা দিচ্ছে না। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতেও দুর্নীতি-নৈরাজ্যের কারণে জনগণের অর্থের অপচয় হচ্ছে। বিজ্ঞান-প্রকৌশল শিক্ষায় শিক্ষার্থীদের প্রচণ্ড আগ্রহ রয়েছে। কিন্তু প্রাথমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষায় যোগ্য শিক্ষক ও গবেষণাগারের অপ্রতুলতায় ছাত্র-ছাত্রীরা প্রকৌশল শিক্ষায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। ফলে দেশের জাতীয় চাহিদা অনুযায়ী উচ্চশিক্ষিত নাগরিক তৈরি হচ্ছে না ফলে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যাও বাড়ছে। এ অবস্থায় সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে দুর্নীতি-নৈরাজ্য দূর করার পাশাপাশি পাঠ্যসূচিতেও ব্যাপক পরিবর্তন আনতে হবে। ভবিষ্যতের দক্ষ নাগরিক তৈরির জন্য দক্ষ শিক্ষক তৈরির ব্যবস্থাও করতে হবে।
মূল সমস্যা হচ্ছে আমাদের দেশে উচ্ছ শিক্ষার রোড ম্যাপের জন্য ছাত্রদের কাউন্সিলিং দেওয়ার মত কোন সিন্টেম আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় নেই। অভিবাবকের টাকার জোরে এবং তাদের ইচ্ছায় ছাত্ররা তৈরী হচ্ছে রেডিমেট শিক্ষিত, কিছু বিশ্ববিদ্যালয় আছে টাকা দিলেই মেয়াদান্তে পাশ ওসার্টিফিকেট। বিদেশে যেমন ল্যাব ফ্যাসিলিটি পর্যাপ্ত এবং সেখানে আছে কো-অপ সিষ্টেম, দ্বিতীয় বর্ষ থেকে সপ্তাহে ২ দিন ইন্ডাষ্ট্রিতে কাজ করা। একদিকে যেমন আয় হয় অন্যদিকে ছাত্রজীবনেই ইন্ডাষ্ট্রির কাজ শিখে ফেলে, ফলে পাশ করেই চাকরী। আমাদের দেশে মেডিকেল পেশা ব্যাতীত আর কোন পেশায় ইর্নটানশীপ নাই বলা যায়।
উপযুক্ত কোন কাউন্সিলিং ব্যবস্থা না থাকায় মেধা, যোগ্যতার আলোকে পড়ালেখা হয় না, ফলে পড়ালেখার সকল ধাপে তৃতীয় শ্রেনী তারপরও এমএ পাশ। এই এমএ পাশ দিয়ে কেরানী হওয়া ছাড়া অন্য কিছু সম্ভব নয়। অথছ যে ছাত্র ভাল রেজাল্ট করতে পারছে না তাকে যদি বিএ এম এ, এমনকি ইঞ্জিনিয়ারিং না পড়িয়ে টেকনিশিয়ান হিসেবে পড়ালেখা করানো হতো তাহলে পাশের পর বেকার হতো না, বরং ভাল টেকনিশিয়ান হতো। আমাদের দেশে টেক্সটাইল, গার্মেন্টস, ফার্মাসিউটিক্যাল, কেমিক্যাল সেক্টরে হাজার হাজার ইন্ডিয়ান, চাইনিজ, জাপানিজ, পাকিস্তানী টেকনিশিয়ান আছে যারা লক্ষ লক্ষ টাকা বেতন পায়, কোন কোন টেকনিশিয়ান ৪-৫ লক্ষ চাকা বেতন পায়। আমাদের দেশে ভাল টেকনিশিয়ান তৈরীর কোন ব্যবস্থা নেই ফলে বিদেশ থেকে আমদানি করা হচ্ছে টেকনিশিয়ান। কিন্তু বিপরীত চিত্র হচ্ছে আমাদের দেশের ছেলেরা বিদেশে যেয়ে ওদের চেয়ে অনেক ভাল করছে, পড়া লেখা এবং চাকুরীতেও। আমেরিকা, কানাডা, অষ্টিলিয়া, নিউজিল্যান্ড, জার্মানীতে আমাদের ভায়েরা, ছেলেরা অনেক ভাল করছে। আমাদের মেধা আছে কিন্ত মেধা বিকাশের ব্যবস্থা নেই তাই আমাদের দেশে বেকার তৈরী হচ্ছে।

বেকার তৈরীর শিক্ষা গ্রহন না করে কাউন্সিলিং এর মাধ্যমে মেধা-যোগ্যতার আলোকে মানবসম্পদ তৈরী করতে হবে। বেকার প্রকৌশলী হওয়ার চেয়ে দক্ষ টেকনিশিয়ান হওয়া ভাল। টেক্সটােইল সেক্টরে অনেক ডিজাইনার, মার্সেনডাইজার আছে যাদের লেখা পড়া এসএসসি বা এইসএসসি কিন্তু বেতন এক লক্ষের কম বেশী পর্যায়ে এবং চাকুরী জীবনে তাদের কদরও আছে কিন্তু দক্ষতা না থাকা প্রকৌশলীর জীবনে আছে অবহেলা আর গঞ্জনা।
প্রকৌশলী হিসেবে পাশ করার পরও যথাযত কাউন্সিলিং না থাকায় নিজের যোগ্যতা, মেধা অনুযায়ী পরিকল্পিত প্রশিক্ষণ নেই বরং আছে এলোমেলোভাবে প্রশিক্ষণ, ইন্ডাষ্ট্রির ফিল্ড অনুযায়ী প্রশিক্ষণ নেই ফলে অন লাইন জব এপ্লাই করার পরও ভাইবার জন্য ডাক পাচ্ছে না কেউ কেউ বছরের পর বছর। সমস্যা সমাধানে প্রয়োজন উপযুক্ত কাউন্সিলিং। শিক্ষা চলাকালে এবং পাশ করার পর পরই উপযুক্ত কাউন্সিলিং দরকার। এ বিষয়ে অভিজ্ঞদের এগিয়ে আসা দরকার, শিক্ষা ব্যবস্থায় পরিবর্তন আবশ্যক।


Facebook Comments