পলিটেকনিক ছাত্রের আবিস্কার “হারানো লঞ্চ খুঁজে বের করবে যে যন্ত্র”


(আমরা সবাইকে অনুরোধ করছি সংবাদটি শেয়ার করার জন্য)

হামজা-রুস্তম নয়, ডুবে যাওয়া লঞ্চ শনাক্ত করবে তরুণ বিজ্ঞানী শাহাবুদ্দীন সামির এক অভিনব প্রকল্প। অত্যন্ত অল্প খরচের এই প্রকল্পের মাধ্যমে যেমন লঞ্চের দিশা পাওয়া যাবে, তেমনি বাঁচানো যাবে যাত্রীদের  প্রাণও। এ ছাড়া লাইফ জ্যাকেটও থাকবে লঞ্চে। যে কেউ সেগুলো মাত্র ৩০ টাকা খরচে তৈরি করতে পারবেন। লঞ্চ শনাক্ত ও প্রাণ বাঁচানো এই প্রকল্প নিয়ে লিখেছেন ওমর শাহেদ ২০০৩ সালে চাঁদপুরের মোহনায় ডুবে গেল একটি লঞ্চ। অনেকে নিহত হলেন। উদ্ধার করতে ছুটে এলো হামজা-রুস্তম। তবে পেল না খুঁজে হাজার চেষ্টায়ও। খুব মন খারাপ হলো ছেলেটির। ভাবতে লাগল, কেন একটি জাহাজ ডুবে যায়? ভেবে ভেবে অনেক কারণও বের করে ফেলল। ঝোড়ো হাওয়ার কবলে পড়লে, যথাযথ ফিটনেস না থাকলে, দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় আইন অমান্য করে চালালে বা চালকের অদক্ষতার কারণে ডুবে যেতে পারে একটি লঞ্চ। নাম গেছে ছড়িয়ে তত দিনে বেশ কয়েকটি আবিষ্কার করে ফেলেছে শাহবুদ্দীন সামি । অল্পবিস্তর নামও ছড়িয়ে গেছে। বিকল্প থার্মোফ্লাস্ক (তাপ কুপরিবাহী তুলা ও কাঠের ভুষি দিয়ে তৈরি), বাতাসের গতি নির্ণয় (ভবনের ভেতরে বসে বাইরের বাতাসের প্রবাহ নির্ণয়), অত্যন্ত আলোচিত অটো রেল কন্ট্রোলার (এক স্টেশনে ট্রেন আসার সঙ্গে সঙ্গে কাছাকাছি স্টেশনের যাত্রীরা স্টেশনে স্থাপিত প্যানেল বোর্ডের মাধ্যমে জানতে পারবেন। ফলে অপেক্ষার প্রহর গুনতে হবে না), সাইকেল থেকে বিদ্যুৎ (দুই ঘণ্টা সাইকেল চালিয়ে চাকার ঘূর্ণনগতিকে কাজে লাগিয়ে ছয় ভোল্টের ব্যাটারি পুরোপুরি চার্জ করা সম্ভব। তাতে বিদ্যুৎবিহীন এলাকায় ছাত্রছাত্রীরা বাতি জ্বালিয়ে করতে পারবে লেখাপড়া)। ভাবনার গভীরে ফলে নবীন এই আবিষ্কারকের খুব ইচ্ছা হলো এমন কিছু আবিষ্কার করতে, যাতে ডুবে যাওয়া লঞ্চ খুঁজে বের করা যায়। আরো ভেবে দেখলেন, ডুবতে শুরু করা মাত্র লঞ্চের গায়ে সিল্ট বা বেলে মাটি জমতে থাকে।

উদ্ধার করতে আসা লঞ্চ পৌঁছানোর আগেই বেলে মাটি জমে, মানুষ ও অন্যান্য দ্রব্যসহ নিজের বিশাল ওজনের ভারে লঞ্চ ডুবে যায়। এসব সমস্যার কথা ভেবে সামি দাঁড় করালেন একটি প্রজেক্ট। নাম দিলেন ‘সামি’স প্রজেক্ট ফর লঞ্চ রিকভারি’ (জীবন রক্ষা ও ডুবন্ত লঞ্চ উদ্ধারে সামির প্রকল্প)। রেডিয়াম ডোম বাঁচাবে জীবন এই প্রকল্পের মূল জিনিসটি হলো একটি বয়া বা রেডিয়াম ডোম। চার ফুট উচ্চতা ও ১০ ফুট প্রস্থের বয়াটি স্থাপিত থাকবে লঞ্চের ছাদে। তাতে সংযুক্ত থাকবে ১০০টি হ্যাঙ্গার বা আংটা।
যাত্রীরা লঞ্চ ডুবে যাওয়ার আগেই এ দুই স্তরের আংটাগুলো ধরে জীবন বাঁচাবেন। লঞ্চ ডুবতে শুরু করামাত্র নাইলনের দড়ির সঙ্গে সংযুক্ত বয়াটি ভেসে উঠবে পানিতে। রেডিয়ামের কাভারযুক্ত বয়াটির গা থেকে আলো জ্বলতে থাকবে। বহু দূর থেকে দেখা যাবে এই আলো।
এদিকে বয়াটির সঙ্গে সংযুক্ত পানিনিরোধক সাইরেন থেকে বিপৎসংকেত বাজতে থাকবে। এই সাইরেন এমনভাবে বানানো যে পানির সংস্পর্শে আসামাত্র এটি বাজতে শুরু করবে স্বয়ংক্রিয়ভাবে। আলোর উৎস ও সাইরেনের প্রবল শব্দে স্থানীয় জনতা, পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস, কোস্টগার্ড সঙ্গে সঙ্গে নামতে পারবে উদ্ধার অভিযানে। লঞ্চ নদীর তলদেশে চলে গেলেও উদ্ধারকারী জাহাজ এসে নাইলনের রশির সূত্র ধরে জাহাজের অবস্থান সহজেই শনাক্ত করতে পারবে। কারণ কর্তৃপক্ষের কাছে জেনে নদীর সর্বোচ্চ গভীরতা অনুযায়ী নাইলনের দড়িটি নেওয়া হবে। দুই ইঞ্চি মোটা হওয়ায় পানির স্রোত বা অন্য কোনো কারণে এটি ছিঁড়ে যাওয়ার নেই কোনো আশঙ্কা।

শাহাবুদ্দীন সামি উদ্ভাবিত জীবন রক্ষা ও ডুবন্ত লঞ্চ শনাক্ত করার এই প্রকল্পটি ১০০ যাত্রী বহনে সক্ষম লঞ্চের জন্য প্রযোজ্য। প্রয়োজনে এই সুবিধা লঞ্চের আয়তন ও যাত্রী ধারণক্ষমতার ওপর নির্ভর করে বাড়ানো কমানো সম্ভব। তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় রেডিয়াম ডোমকে আরো উন্নততর করা সম্ভব বলে দাবি করেন আবিষ্কারক। থাকবে লাইফ জ্যাকেট মানুষের জীবনের নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য লঞ্চে লাইফ জ্যাকেটও রাখার পরিকল্পনা আছে সামির। এই জ্যাকেটগুলো বয়ার সঙ্গে লকার বেল্ট দিয়ে সংযুক্ত থাকবে। একটি ১০০ জন যাত্রীর লঞ্চে ৫০টি জ্যাকেট রাখার পরিকল্পনা আছে সামির। অতিরিক্ত যাত্রীরা এগুলো ব্যবহার করতে পারবেন। জ্যাকেটগুলোর দাম পড়বে মাত্র ৩০ টাকা। যে কেউ এগুলো তৈরি করতে পারবেন। চাই কেবল চটের বস্তা ও দুই লিটার পেপসি বা কোকজাতীয় পানীয়ের ছয়টি মুখ লাগানো খালি বোতল। তিনটি বোতল বস্তার সামনে- পেছনে ওপর-নিচ ও মাঝামাঝি জায়গায় সেলাই করে নিতে হবে সুতা দিয়ে। প্রশংসার জোয়ারে ভেসে এই অভিনব প্রকল্পটি জাতীয় বিজ্ঞান ও যোগাযোগপ্রযুক্ত  সপ্তাহ-২০০৫-এ নেত্রকোনার ছেলেটিকে জেলার শ্রেষ্ঠ খুদে বিজ্ঞানীর পুরস্কার এনে দেয়।
নেত্রকোনা টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজের নবম শ্রেণির ছাত্রটির উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেন প্রধান অতিথি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য ড. আমিরুল ইসলাম। ১৭ আগস্ট ২০০৫ তাঁর আমন্ত্রণে নেত্রকোনা জেলা শিক্ষা অফিসারের সঙ্গে সামি পৌঁছে যান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে। কনফারেন্স রুমে বিভিন্ন অনুষদের ডিন, বিভাগীয় প্রধান ও শিক্ষকদের উপস্থিতিতে সামিকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। তাঁর তিনটি প্রকল্প- অটো রেল কন্ট্রোলার, অটো ব্রিজ সিগন্যাল (ছোট সড়কের অপর পাশের গাড়ির চালককে এই যন্ত্র সিগন্যাল দিয়ে জানিয়ে দেবে যে ব্রিজের ওপর গাড়ি আছে। ফলে এড়ানো যাবে মুখোমুখি সংঘর্ষ) ও ডুবন্ত লঞ্চ উদ্ধার মডেল গ্রহণ করেন উপাচার্য। ছাত্রছাত্রী ও গবেষকদের দেখার জন্য, জানার জন্য সেগুলো বিশ্ববিদ্যালয় জাদুঘরে সংরক্ষণ করা হয়। সেদিন ড. আমিরুল ইসলাম বলেছিলেন, ‘তুমি যা কিছুই আবিষ্কার করো না কেন, সেগুলো যেন এই জাতির জন্য কল্যাণকর হয়।’ -শাহাবুদ্দীন সামির আবিষ্কার : ১. অটো রেল কন্ট্রোলার ২. রেলের সিগন্যাল স্টেশন ৩. অটো ব্রিজ সিগন্যাল ৪. বিকল্প থার্মোফ্লাস্ক ৫. বাতাসের গতি নির্ণায়ক ৬. দুর্ঘটনায় ডুবন্ত লঞ্চ উদ্ধার ও জীবনরক্ষা প্রজেক্ট ৭. লাইফ জ্যাকেট ও ৮. গ্রামীণ ফিল্টার।

শাহাবুদ্দীন সামি, ঢাকা পলিটেকনিক ইন্সটিটিউট

উৎসঃ দৈনিক কালের কন্ঠ।

(আমরা সবাইকে অনুরোধ করছি সংবাদটি শেয়ার করার জন্য)


Facebook Comments